ডাইনোসর  আর এর বিলুপ্তি…

ডাইনোসর বলতে জনপ্রিয় ধারণায় একটি অধুনা অবলুপ্ত, সাধারণত বৃহদাকার মেরুদণ্ডী প্রাণীগোষ্ঠীকে বোঝায়। এরা পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের প্রাগৈতিহাসিক অধিবাসী এবং বৈজ্ঞানিকদের অনুমান এই প্রভাবশালী প্রাণীরা প্রায় ১৬ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে। প্রথম ডাইনোসরের বিবর্তন হয়েছিল আনুমানিক ২৩ কোটি বছর পূর্বে। ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর পূর্বে একটি বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডাইনোসরদের প্রভাবকে পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেয়। তাদের একটি শ্রেণীই কেবল বর্তমান যুগ পর্যন্ত টিকে থাকতে পেরেছে বলে ধারণা করা হয়। শ্রেণীবিন্যাসবিদরা ধারণা করেন আধুনিক পাখিরা থেরোপড ডাইনোসরদের সরাসরি বংশধর, জীবাশ্ম দ্বারা প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে জুরাসিক যুগে সংঘটিত এই বিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়।

শ্রেণীবিন্যাসগত, অঙ্গসংস্থানগত ও পরিবেশগত দিক থেকে ডাইনোসর কথাটিকে বিভিন্ন প্রকারের কতকগুলি প্রাণীর একটি সাধারণ নাম হিসেবে  বর্ণনা করা যেতে পারে। জীবাশ্ম প্রমাণ থেকে পুরাজীববিদরা উড়তে অক্ষম ডাইনোসরদের ৫০০ এরও বেশি গণ ও ১০০০ এরও বেশি প্রজাতিকে শনাক্ত করেছেন। সব কয়টি মহাদেশেই ডাইনোসরদের জীবন্ত ও প্রস্তরীভূত নানা প্রজাতির দেখা পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে শাকাহারী ও মাংসাশী- উভয় প্রকার উদাহরণই রয়েছে। যদিও উৎপত্তিগতভাবে ডাইনোসরেরা দ্বিপদ, কিন্তু অবলুপ্ত অনেক চতুষ্পদ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে এবং কোনো কোনো প্রজাতি গমনের সময় প্রয়োজনমত দুই পা অথবা চার পা ব্যবহার করতে পারত। সমস্ত বিভাগের ডাইনোসরদের মধ্যেই শিং, হাড় ও চামড়ার পাত প্রভৃতি প্রদর্শনমূলক অঙ্গসংস্থানের নিদর্শন রয়েছে, এবং কোনো কোনো অবলুপ্ত প্রজাতির কংকালে হাড়ের বর্ম ও কাঁটার মত গঠন লক্ষ্য করা যায়। বিভাগ নির্বিশেষে ডাইনোসরদের অন্যতম সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল ডিম পাড়া ও বাসা বানানোর অভ্যাস। ওড়ার খাতিরে কিছু শারীরবৃত্তীয় বাধ্যবাধকতার জন্য আধুনিক পাখিরা আকারে ছোট হলেও প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরদের অনেকেই ছিল বিশালদেহী। বৃহত্তম সরোপড ডাইনোসরেরা ৫৮ মিটার (১৯০ ফুট) পর্যন্ত দীর্ঘ এবং ৯.২৫ মিটার (৩০ ফুট ৪ ইঞ্চি) পর্যন্ত উঁচু হত। তবুও উড়তে অক্ষম ডাইনোসর মাত্রই বিশালাকার হবে- এই ধারণাটা ভুল। আবিষ্কৃত জীবাশ্মের বেশির ভাগই বড় মাপের ডাইনোসর- একথা ঠিক। কিন্তু এর কারণ হল জীবাশ্মের আকার বড় হলে তা প্রকৃতির প্রতিকূলতা সহ্য করে প্রস্তরীভবন পর্যন্ত সহজে টিকে থাকতে পারে। আসলে অনেক ডাইনোসরই ছিল খুদে যেমন- জিজিয়ানিকাস নামক ডাইনোসরটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৫০ সেন্টিমিটার (প্রায় ২০ ইঞ্চি)।

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ডাইনোসরের প্রথম জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়। এরপর থেকে পর্বতগাত্র বা শিলায় আটকা পড়ে থাকা ডাইনোসরের কঙ্কাল পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ডাইনোসরেরা বর্তমান বিশ্ব সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। প্রধানত কোনো কোনো অবলুপ্ত ডাইনোসর প্রজাতির বিশাল আয়তন এবং তাদের সম্ভাব্য হিংস্র স্বভাবের দরুণ তারা শিশু ও বয়স্ক সবার কাছেই বিশেষ আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সর্বাধিক বিক্রিত বই এবং জুরাসিক পার্ক ইত্যাদি প্রচুর কাটতি পাওয়া চলচ্চিত্রে ডাইনোসর প্রসঙ্গ এসেছে এবং এ সংক্রান্ত নতুন যে কোনো আবিষ্কার গণমাধ্যমে বিশেষভাবে সম্প্রচার করা হচ্ছে।

ডাইনোসরএর শব্দউৎস

গ্রিক δεινός (deinos, ভয়ঙ্কর, ভয়াল বিশাল) এবং σαορος (sauros, টিকটিকি বা সরীসৃপ) এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে ইংরেজ জীববিজ্ঞানী স্যার রিচারড ওয়েন ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম Dinosaur শব্দ ব্যবহার করেন। কালক্রমে এই শব্দটি অন্যান্য ভাষায় প্রবেশ করেছে। বাংলা ডাইনোসর শব্দটি ইংরেজি Dinosaur শব্দের ধ্বনিগত রূপ মাত্র।

ডাইনোসর বিলুপ্তির কারণ

পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্তির কারণ হিসাবে, বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মতবাদ প্রকাশ করেছেন। এ সকল মতবাদ নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। যেমন—

     ১। উল্কাপাত: ক্রেটাসিয়াস অধিযুগে শেষের দিকে প্রচণ্ড গতিতে কোন বিশালাকারের উল্কা ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছিল। এর ফলে একটি মহাবিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছিল। এই বিস্ফোরণের পর, তাৎক্ষণিকভাবে সমগ্র পৃথিবীর তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ ছাড়া সারা পৃথিবী ধুলা এবং জলীয়-মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। এই মেঘের আবরণ ভেদ করে সূর্যের কিরণ পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে না পারায়, সবুজ উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে ডাইনোসরদের খাদ্য খাটতি পড়ে এবং উত্তাপহীন পৃথিবীতে শীতল রক্তের এই ডাইনোসারগুলো মৃত্যুবরণ করে।

অনেকে উল্কাপাতের সময় উল্কার ভিতরের ইরিডিয়াম নামক ধাতুর বিকিরণকে দায়ী করেছেন বটে। তবে বিজ্ঞানীরা ভূপৃষ্টের কাছাকাছি স্তরে কোন ইরিডিয়ামের সন্ধান পান নাই। তারপরেও অনেকে এমন ধারণাও করেন যে- উল্কা খণ্ডের ভিতরই ইরিডিয়াম ছিল। এই তর্কবিতর্কের ভিতরই এক সময় বিজ্ঞানীরা মার্কিন যুক্তরাষ্টে্রর আরিজোনা অঞ্চলের  ফ্লাগস্টাফে একটি বিশাল গর্ত আবিষ্কার করেন এবং সেখানে তিনি একটি উল্কা-খণ্ডের সন্ধান পান। উল্লেখ্য ক্যানিয়ান ডিয়াব্লো নামক এই গর্তটির ব্যাস ১১৮০ মিটার এবং গভীরতা ১৭৫ মিটার। অস্ট্রেলিয়াতে অপর একটি উল্কা পাওয়া যায়। এর ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে, বয়স নিরূপণ করা হয়েছে ৬ কোটি ৪০ লক্ষ বৎসর পূর্বকাল।

     উল্কা-ধারণার বিপক্ষযুক্তি: এই যুক্তির বিপক্ষবাদীরা প্রশ্ন তোলেন যে, এতবড় একটি বিস্ফোরণের ফলে শুধু মাত্র ডাইনোসরই ধ্বংস হবে কেন ? এর কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায় নাই।

     ২। খাদ্য হিসাবে ডাইনোসরের বিলুপ্তি: সকল মাংসাশী ডাইনোসরগুলো সকল উদ্ভিদভোজী ডাইনোসরদেরকে হত্যা করে। পরে, খাদ্যের