রিক্সা!! বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় বাহন।

রিক্সা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ বাহন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে রিকশা একটি বহুল ব্যবহৃত পুরোন যানবাহন। এদেশের আনাচে কানাচে রয়েছে রিকশা। দেশটির রাজধানী ঢাকা বিশ্বের রিকশা রাজধানী নামেও পরিচিত বলা যায়। এটি বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেমন চীন, জাপান, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, মালোশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স, কম্বোডিয়া সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেগুলোতে দেখা যায় । রিক্সা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত। চীনে এটি সানলুঞ্ছে, কম্বোডিয়ায় সীক্লো, মালোশিয়ায় বেকা, ফ্রান্সে সাইক্লো আর ইউরোপে পেডিক্যাব নামে পরিচিত।

বাংলা রিক্সা শব্দটি এসেছে জাপানী জিন্‌রিকিশা  শব্দটি থেকে। চীনা ভাষাই জিন্  অর্থ  মানুষ, রিকি  অর্থ  শক্তি, আর শা  অর্থ বাহন। অর্থাৎ এর অর্থ হল মনুষ্যচালিত যান

পূর্বে সময় যখন রিক্সা প্রথম চালু হয় তখন তা মানুষ দিয়ে টানা দুই চাকা বিশিষ্ট বাহন ছিল। এর দুই পাশে দুটো রড সামনে পর্যন্ত সংযুক্তযা ধরে rickshawচালক হাত দিয়ে টেনে নিয়ে যেত। রিক্সাতে সাধারনত দুটি যাত্রী সিট থাকলেও মাঝেমাঝে তিন জনও উঠতে দেখে যায়।এখন এটিতে তিন চাকা যা চালক প্যাডেলের মাধ্যমে চালিয়ে থাকে। যারা রিক্সা চালায় তাদেরকে বাংলায় রিকশা-ওয়ালা বলা হয়ে থাকে।

বর্তমানে ঢাকাতে ৩০০০০০ এর বেশি রিক্সা চলাচল করে। শুধু ঢাকাতেয় নয় বাংলাদেশের প্রাই প্রতিটা গ্রাম ও শহরে রিক্সা রয়েছে। বাংলাদেশে সাধারনত অন্যান্য বাহন এর তুলনাই রিক্সা সবথেকে বেশি চলাচল করে।

১৮৮০ সালের দিকে রিক্সা প্রথম তৈরি করা হয় এবং পরে এটা প্রথম সিঙ্গাপুরে ১৯২৯ সালের দিকে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার শুর হয়। ছয় বছর পরে এই টানা রিক্সা ছড়িয়ে যায়। পরে ১৯৫০ সালে রিক্সা দক্ষিণ ও পর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে দেখতে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে সারা বিশ্বে প্রায় চার মিলিয়নের মতো রিক্সা পাওয়া যায়। কিছু উৎস থেকে যানা যায় ঢাকাতে প্রথম লাইসেন্স ইস্যু করা হয় ১৯৪৪ সালের দিকে।

রিকশাচিত্র, চিত্রকলার আলাদা একটি মাত্রা বলা যায়। যেকোনো চিত্রই রিকশার পিছনে আঁকলেই তা রিকশাচিত্র হলেও, মূলত রিকশাচিত্র বলতে উজ্জ্বল রঙে আঁকা কিছু চিত্রকে বোঝায়, যা খুব সাবলিল ভঙিতে বিষয়বস্তুকে উপস্থাপন করতে সক্ষম। সাধারণত ভারত এবং বাংলাদেশের রিকশার পিছনে, হুডে এবং ছোট ছোট অনুষঙ্গে এই বিশেষ চিত্রকলা লক্ষ করা যায়। বিশেষজ্ঞগণ এধরণের চিত্রকলাকে ফোক আর্ট, পপ আর্ট কিংবা ক্র্যাফট সব দিক দিয়েই আলোচনা করতে পছন্দ করেন। তাঁদের মতে, যেকোনো বস্তুরই  ফর্ম  আর  ডেকোরেশন নামে দুটি দিক থাকলেও রিকশাচিত্র কেবলই একপ্রকার ‘ডেকোরেশন’, এর ব্যবহারিক কোনো দিক নেই। চিত্রকরদের মতে, রিকশাচিত্রের টান বা আঁচড়গুলো খুবই সাবলিল, প্রাণবন্ত এবং স্পষ্ট, এবং টানগুলো হয় ছোট ছোট ও নিখুঁত। অথচ এই বিশেষ চিত্রকলার জন্য নেই কোনো আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, একেবারে দেশজ কুটিরশিল্পের মতই শিল্পীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে শিখে থাকেন এই চিত্রশিল্প এবং নিজের কল্পনা থেকেই এঁকে থাকেন এসব চিত্র। যদিও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর লোকজন রিকশাচিত্রের মর্যাদা সম্পর্কে অতোটা ওয়াকিবহাল নন এবং কিছুটা হেয় করেই দেখে থাকেন।

বাংলাদেশে রিকশাচিত্র ১৯৫০-এর দশক থেকে প্রচলিত, এবং রিকশার প্রায় সম্ভাব্য সবগুলো অংশই চিত্রিত করার একটা প্রয়াস লক্ষ করা যেত। জ্যামিতিক নকশার পাশাপাশি ফুল, পাখি এমনকি জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের ছবি আঁকারও প্রচলন ছিল। কখনও রিকশাচিত্রে রিকশাওয়ালার ধর্মীয় বিশ্বাস প্রতিফলিত হতো, আবার কখনও হয়তো নিছক কোনো বক্তব্য কিংবা সামাজিক কোনো বিষয় দেখা যেত। তবে আধুনিক জগতে বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি সহজলভ্য হওয়ায় হাতে আঁকা সেসব চিত্রকর্ম এখন আর সচরাচর দেখা যায় না, বরং বিভিন্ন জায়গা থেকে ছবি কম্পিউটারে কাটছাট করে সাজিয়ে টিনের ধাতব প্লেটে সেগুলো ছাপ দিয়ে খুব সহজেই তৈরি করা হয় এখনকার রিকশাচিত্রগুলো, সেখানে থাকেনা দেশজ কোনো ঐতিহ্য, থাকেনা কোনো চিত্রকলার মোটিফ, বরং থাকে চলচ্চিত্রের পোস্টার কিংবা নায়ক-নায়িকার ছবি।

সেই অতীত থেকে বর্তমান সময়েও রিক্সা চালনাকে সর্বনিম্ন জীবিকা বাবস্থা বলে মনে করা হয়। খুব সংখ্যক যাত্রীর কাছ থেকে রিক্সা চালকেরা প্রাপ্য সম্মান পেয়ে থাকে। এই রিক্সা চালকেরা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে ঘূর্ণায়মান এবং কিছুটা পরিমাণ হলেও পরিবেশকে কার্বন মুক্ত করছে। রিক্সা বাংলাদেশের এবং বিশেষ করে তার নকশা এবং শিল্পকলা জন্য একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাই এই রিক্সাকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য হিসাবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা আমাদেরেই দায়িত্ব।

No comments yet.

-যা কিছু বলার-