“প্রিজনারস” – মুভি রিভিউ

হিউ জ্যাকম্যান অভিনীত নতুন একটি ছবি দেখলাম। ছবিটির টাইটেল হল “প্রিজনারস”। অ্যাকশন থ্রিলার ধাঁচের এই ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ২০১৩ তে আর এতে অভিনয় করেছেন।

হিউ জ্যাকম্যান (কেলার ডোভের)
জ্যাক গিলেনহাল (ডিটেকটিভ ডেভিড লোকি)
ভায়োলা ডেভিস (ন্যান্সি বার্চ)
মারিয়া বেল্লো (গ্রেস ডোভের)
টেরেন্স হাওয়ার্ড (ফ্রাঙ্কলিন বার্চ)
মেলিসা লিও (হোলি জোন্স)
পল ড্যানো (অ্যালেক্স জোন্স)
ছবিটির বর্তমান আই.এম.ডি.বি রেটিং হল ৮.১।

আরো প্রমুখ, ছবিটি পরিচালনা করেছেন ডেনিস ভিলনভা । ছবিটির কাহিনী হল পেনসিলভানিয়াতে দুই বাচ্চা মেয়ের অপহরণ ও একজন বাবা তার মেয়েকে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা নিয়ে। ছবিটিতে মূল চরিত্র বাবা ভূমিকায় অভিনয় করেছেন হিউ জ্যাকম্যান ও তদন্তকারী ডিটেকটিভের ভূমিকায় জ্যাক গিলেনহাল।

গল্পের শুরুটা কেলার ডোভের এবং ফ্রাঙ্কলিন বার্চ পরিবারকে নিয়ে। থ্যাংকস গিভিংডেতে প্রতিবেশী ফ্রাঙ্কলিন বার্চ এর বাসাতে দাওয়াত খেতে যান ডোভের পরিবার। পরিবার বলতে তার কিশোর ছেলে আর ছোট মেয়ে এবং তার পত্নী। ফ্রাঙ্কলিন পরিবার ও বেশী বড় নয় তার মেয়ে দুটি কেলারের ছেলে মেয়ের প্রায় সমবয়সী। খাওয়া শেষে দুই পরিবারের বড় সদস্যরা গল্প গুজবে ব্যাস্ত হয়ে পড়েন তখন কেলারের ছোট মেয়েটি তার সমবয়সী মেয়েটিকে নিয়ে তাদের বাসায় যেতে চান। আড্ডায় ব্যাস্ত থাকা কেলার, মেয়েকে তার ভাইকে সাথে করে নিয়ে যেতে বলেন।

অনেকখন গল্পগুজবে ব্যাস্ত থাকার পর কেলার মেয়ের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলেন মেয়ে দুটি বাসায় ফিরে আসেনি এবং মেয়েটি তার কথামত তার ভাইকে সাথে নিয়েও বাসা থেকে বের হয়নি। তিনি তাৎক্ষনিক নিজ বাসায় যান মেয়েকে খুঁজতে এবং না পেয়ে ফিরে আসেন। কেলার এবং ফ্রাঙ্কলিন আশপাশে খুঁজে তাদের মেয়েকে না পেয়ে অবশেষে পুলিশের শরণাপন্ন হন।

ডিটেকটিভ ডেভিড লোকির উপর তদন্তের দায়িত্ব পরে হারানো মেয়ে দুটিকে উদ্ধারের। ডিটেকটিভ তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারেন মেয়ে দুটি হারানোর আগ মুহূর্তে তাদের বাসার রাস্তার উপর একটি আরভি (Recreational vehicle ) গাড়ি অবস্থান করছিলো। পুলিশ আরভি গাড়িটির সন্ধান পান এবং তার মধ্যে থেকে অ্যালেক্স জোন্স নামে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছেলেকে পালানোর চেষ্টার সময় গ্রেফতার করেন তার আই কিউ লেভেল ছিলো দশ বছরের বাচ্চাদের সমান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকে জেরা করেও দুই একটির বেশী কথা বের করতে ব্যার্থ হন তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং তার ব্যাবহার করা গাড়িটি তল্লাশি চালিয়ে কোন আলামত না পাওয়াতে শেষমেশ তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। অ্যালেক্স এর হয়ে জামিন করেন হোলি জোন্স সম্পর্কে তিনি আত্মীয় যার বাসায় সে বসবাস করতো।

Prisoners-movie-review-cast

এদিকে অফিসার লোকি তদন্ত স্বার্থে লোকাল প্রিস্ট এর বাসায় যান কিন্তু প্রিস্ট মাতাল অবস্থাতে থাকায় জানালা দিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করেন এবং একটি গুপ্ত কুঠরির সন্ধান পান যার মধ্যে অনেক আগের এক হাত পা মুখ বাঁধা এক ব্যাক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করেন মৃতদেহের গলাতে একটি চেইন ছিলো যাহাতে গোলকধাঁধা এর মতো একটা বস্তু আটকানো ছিলো। প্রিস্টকে গ্রেফতার করা হলে তিনি বলেন লোকটি তার কাছে কনফেশন করতে গিয়ে বলেছিলো সে আত্মস্বীকৃত ১৬টি বাচ্চার হত্যাকারী তাই তিনি তাকে তার বাসার নিচে গুপ্ত কুঠরিতে বেঁধে রাখেন।

অ্যালেক্সর জামিন পাওয়া নিয়ে ব্যাক্তিগত ভাবে প্রচণ্ড হতাশ এবং ক্ষিপ্ত ছিলো কেলার। জামিনের পর আন্টির সাথে বের হয়ে যখন গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন তখন নিউজ কাভার করতে আশা সাংবাদিকদের সামনে কেলার আক্রমন করে বসে অ্যালেক্সকে। তার বদ্ধমূল ধারনা ছিল অ্যালেক্স সেই ব্যাক্তি যে তার আর ফ্রাঙ্কলিন এর মেয়েকে অপহরন করেছে। একটা সময় কেলার প্রচন্ডভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে অ্যালেক্সকে অপহরন করে তার পৈতৃক সুত্রে পাওয়া অব্যাবহৃত বাড়িটিতে আটকিয়ে চরম নির্যাতন শুরু করে। প্রথমে ফ্রাঙ্কলিন সমর্থন না দিলেও পরে মেয়ের কথা বিবেচনা করে এই কাজে সহায়তা প্রদান করে।

চৌকস পুলিশ অফিসার লোকি যে তার জীবনে কোন কেসে আজ পর্যন্ত ব্যার্থ হয়নি তিনি মহাবিপদে পরে যান এখনও পর্যন্ত বাচ্চাদুটি উদ্ধারের সঠিক কোন ক্লু পাচ্ছিলেন না। এদিকে শহরবাসীরা সব একত্রিত হয়ে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদুটির বাসার সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করে। উপস্থিত ব্যাক্তিদের মধ্যে অফিসার লোকির একজনকে সন্দেহ হয় তাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদের আগে ব্যাক্তিটি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে সন্দেহকারীর স্কেচ এঁকে টিভিতে দেওয়া হয়।

prisoners1_2663853b

হঠাৎ করে অ্যালেক্স অন্তর্ধান হওয়ার ঘটনাতে লোকি সন্দেহ করেন কেলারকে এবং তাকে অনুসরণ গিয়ে এক পর্যায়ে ধরা পড়েন যান তিনি। তাছাড়া শক্ত কোন প্রমান জোগাড় করতে পারছিলেন না কেলারকে গ্রেফতারের জন্য। লোকি ইন্টারনেট থেকে জানতে পারেন কেলার এর বাবা সাবেক একজন অফিসার ছিলেন যিনি আত্মহত্যা করেছেন এবং এও জানতে পারেন তাকে অনুসরণ করে যে এলাকাতে তিনি গিয়েছিলেন ওখানে পৈতৃক সুত্রে প্রাপ্ত তার একটি বাসা আছে। ঠিকানা অনুযায়ী তিনি ওই বাসায় যান সেই মুহূর্তে বাসায় অবস্থান করছিলেন কেলার এবং তিনি ডিটেকটিভের উপস্থিতি টের পেয়ে যান। পরিত্যাক্ত বাসায় তল্লাশির উদ্দেশে প্রবেশ করে দেখেন আগে থেকে উপস্থিত কেলার ময়লার মধ্যে মাতাল হয়ে ঘুমিয়ে আছে তার মাথার সামনে মদের বোতল রাখা। লোকি তখন তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বাসাটি ঘুরে ফিরে দেখছিলো তখন তার সেলফোনে একটি কল আসে, এক মহিলা ফোন করে জানায় সন্দেহকারী তার সামনে দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যাচ্ছে এবং তিনি তার গাড়ির নাম্বার নিয়েছেন।

জ্যাক সন্দেহকারী বব টেলরকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করার পর বাসা থেকে গোলকধাঁধার আঁকা ছবি বা এই ধাঁধা সম্পর্কিত বই বাচ্চাদের রক্তমাখা কাপড় ও অনেকগুলো বাক্স ভর্তি সাপ জব্দ করেন। বব গ্রেফতারের পর পুলিশ কাস্টডিতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অতর্কিত ভাবে পুলিশের পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার বাসা থেকে উদ্ধারকৃত রক্তমাখা কাপড়ের নমুনা পরীক্ষা করে জানা যায় রক্ত কোন বাচ্চার নয় কাপড়গুলোতে শুঁকরের রক্ত লাগানো ছিলো। এদিকে কেলারের পুরানো বাসা তল্লাশি করে অ্যালেক্স কে উদ্ধার করা হয়।

ঘটনা আবার নতুন করে মোড় নেয় অপহরকারিদের হাত থেকে ফ্রাঙ্কলিনের মেয়ে পালিয়ে আসে। কেলার পরিবার তার সাথে হাসপাতালে দেখা করতে গেলে মেয়েটা কেলার কে জানায় তাকে যেখানে আটকিয়ে রাখা হয়েছিলো কেলার সেখানে গিয়েছিলেন। কেলারের কাছে ঘটনা দিনের মত পরিস্কার হয়ে যায় অপহরণকারী আর কেউ নয় অ্যালেক্স এর আন্টি হোলি জোন্স।

কেলার তাৎক্ষণিক জোন্সদের বাসায় যাওয়ার পর হোলি জোন্স তার আসার উদ্দেশ্য বুজতে পারে এবং তাকে বন্দী ফেলে এবং কথায় কথায় স্বীকার করে তার ছেলে অ্যালেক্স মারা যাওয়ার পর তারা স্বামী স্ত্রী মিলে অনেক বাচ্চা অপহরন করে এনেছে যাদের মধ্যে বব ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী অ্যালেক্স (যার আসল নাম অ্যালেক্স নয়)ও আছে। হোলি তার স্বামীর বানানো একরকম চেতনানাশক তরল খেতে বাধ্য করে কেলারকে পরে তার বাসার সামনে গাড়ির তলাতে এক গুপ্ত গর্ত আছে তার মধ্যে ফেলে দেয়। এদিকে ঔষধ এর প্রভাবে ধীরে ধীরে কেলারের চেতনা লোপ পাচ্ছিলো এরি মাঝে ওই গর্তের মধ্যে তার মেয়ের ব্যাবহারকৃত হুইসেলটি সে দেখতে পান।

কেলারের খোঁজে ডিটেকটিভ লোকি হসপিটালে গিয়ে জানতে পারেন কেলার বের হয়ে গেছে কই গেছে কোথায় গেছে কেউ জানে না।

অ্যালেক্স এর উদ্ধারের খবর নিয়ে হোলি জোন্স এর সাথে দেখা করতে যান ডিটেকটিভ লোকি। বাসায় যাওয়ার পর কাউকে খুঁজে না পেয়ে যখন বাসার ভিতর প্রবেশ করে তখন মিঃ জোন্স এর ছবি দেখে লোকি অবাক হয়ে যায়। প্রিস্টের বাসায় উদ্ধারকৃত মৃতদেহ এর গলাতে যে গোলক ধাঁধা ওয়ালা চেনটি ঝুলানো ছিলো মিঃ জোন্স ঠিক ঠিক একই চেন পড়া তখন লোকির কাছে সব দিনের মত পরিষ্কার হয়ে যায়।

লোকির গুলির আঘাতে হোলি জোন্স মারা যান এবং তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন। কেলারের মেয়েকে জোন্সদের বাসা থেকে উদ্ধার করে হসপিটালে রেখে আসেন। কেলার তখনও নিখোঁজ ছিলেন।

সর্বশেষ জোন্সদের বাসার আসে পাশে খোঁড়া হচ্ছিলো যে কোন মৃতদেহ আছে কিনা, রাত্র হওয়ার কারনে যখন খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করে সবাই চলে গেলো, লোকি ও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন হাল্কাভাবে একটা হুইসেল এর শব্ধ পান। প্রথমে আমলে না নিলেও দ্বিতীয়বার শব্দ শুনে তার সন্দেহ জাগে। এখানে ছবিটির সমাপ্তি।

১৫৩ মিনিটের এই ছবিটিতে সবচেয়ে যেটির প্রশংসা করতে হবে তাহলো ক্যামেরার অসাধারণ কাজ। ছবিটির ক্যামেরাম্যান রজার.এ.ডিকেন্স এবার অস্কারে সেরা ক্যামেরাম্যান হিসেবে নমিনেশন পেয়েছিলেন। ছবিটির কাহিনী কিছুটা দীর্ঘ হলেও নানারকম ঘটনার মোরে দর্শককে আকৃষ্ট করে রাখে। পুরো ছবিটিতে অভিনয়ের বিচার করলে হিউ জ্যাকম্যান এর চেয়ে জ্যাক গিলেনহালের অভিনয় অনেকাংশে ভালো হয়েছে। বাণিজ্যিক ভাবে ছবিটি মোটামুটি ভাবে ব্যাবসা সফল হয়েছে বলা যায়। ছবিটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ৪৬ মিলিয়ন ইউ.এস.ডি এবং আয় হয়েছে ১২,২১,২৬,৬৮৭ ইউ.এস.ডি।

No comments yet.

-যা কিছু বলার-