শব্দাতংক

Acousticophobia নামে একটা শব্দ আছে। এই শব্দের অর্থ হলো শব্দাতংক!

শব্দাতংক বিষয়টি আসলে কি?
সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা ট্যাখ্যায় না গিয়ে অভিজ্ঞতা থেকে বলি। রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছি, হঠাৎ পাশ দিয়ে বজ্রপাতের শব্দ তুলে একটা গাড়ি চলে গেলো, আমি বুঝলাম না কি হলো, কিন্তু আমি মুহূর্তের জন্য সাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারালাম, বা দিকে কাঁত হয়ে ঘুরে গেলো সামনের চাকা, ফোঁস করে আর একটা তীব্র গতির গাড়ি পাশ দিয়ে বেড়িয়ে গেল! আমার বুকের ভেতরটা তখন কাঁপছে! নাহ, এই মুহূর্তে যে গাড়িটা সামান্যর জন্য আমার সাইকেলের সামনের চাকাটা থেঁতলে দিয়ে যায় নি, তার জন্য না। খানিক আগে বজ্রপাতের শব্দ তুলে চলে যাওয়া গাড়িটার শব্দের জন্য!
আমার বুকের ভেতর মুহূর্তের জন্য আমার হার্ট বিট মিস করেছে!

নাহ, আমি মোটেই Acousticophobia’র পেশেনট নই। এবং এই ঘটনাটা যে শুধু Acousticophobia’র পেশেনট দের ক্ষেত্রেই ঘটে বিষয়টা তাও না। উপরের ঘটনাটা ঘটে যেতে পারে যে কারো ক্ষেত্রেই। কারণ শব্দ ভয়ংকর জিনিস।

আমার এক দুঃসম্পর্কের বৃদ্ধ দাদার হার্ট এটাক হয়েছিলো, সিমপ্লি প্ল্যাস্টিকের একটা চানাচুরের প্যাকেট ফোটানোর আচমকা তীব্র শব্দে!
লঞ্চের কার্নিশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন বৃদ্ধ এক হকার, মাথায় আনারসের বোঝা। ঠিক সেই মুহূর্তে তীব্র শব্দে সাইরেন বাজাল পাশের অন্য এক লঞ্চ, বৃদ্ধ আনারস বিক্রেতা মুহূর্তে কেঁপে উঠলেন, ভারসাম্য হারালেন, ছিটকে পড়লেন নদীর জলে। সাথে এক ঝাঁকা আনারসও।
ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারছি, সবার হাতে চায়ের কাপ। কান ফাটানো আওয়াজে ঝড়ের বেগে বিশেষ এক গাড়ি চলে গেলো ফুটপাত ঘেঁসে, সাকিবের হাতের চায়ের কাপ থেকে যেন গরম চা মুহূর্তে ছলকে উঠে ছোবল মারল ওর মুখে। পুড়ে দগদগে হয়ে গেলো মুখ…

Fear of noice

না এরা কেউ Acousticophobia’র রোগী নন। আপনার আমার মতো দিব্যি সুস্থ মানুষ। কিন্তু প্রচণ্ড শব্দাতংকে এই মানুষগুলো মুহূর্তে মস্তিস্কে আঘাত পান, সেই আঘাত কতটা তীব্র তা এইসব ভারসাম্য হারানোর মত ছোটখাটো ঘটনা লক্ষ্য করলেই পরিস্কার। ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, ভারসাম্যহীনতার এই যে ঘটনা বা প্রতিক্রিয়া তা কিন্তু হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ থেকে আসা বাহ্যিক রিফ্লেক্সন মাত্র। ভয়ংকর বিষয়গুলো ঘটে শরীরের ভেতরে, মস্তিস্কে।

সেগুলো আসলেই ভয়াবহ!

এই এতোগুলো কথা বলার উদ্দেশ্য নিতান্তই ছোট। কিংবা ছোট না।
আমি জীবনে খুব বেশি প্রাইভেট গাড়ীতে চড়ি নাই। এখনও কারো ঝা চকচকে প্রাইভেট গাড়ীতে উঠলে, নামার সময় বিব্রত লাগে এই ভেবে যে যদি গাড়ীর দরজা ঠিকমতো খুলতে না পারি, যদি গ্লাস নামাতে না পারি!! আরও অনেক কিছু! তাই হয়তো গাড়ী বিলাস সম্পর্কে আমার ধারণা নেহাতই অজ্ঞতার চূড়ান্ত। তারপরও, ধৃষ্টতা নিয়েই বলছি, আজকাল হরহামেশা রাস্তায় ঝড়ের বেগে একধরনের গাড়ি যেতে দেখা যায়, সেইসব গাড়ী থেকে ভয়াবহ এবং ভয়াবহ এবং ভয়াবহ রকম ভয়ংকর শব্দ বের হয়, যা শুনলে পথচারি, সাইকেল আরোহী, রিকশাযাত্রী, রিকশাচালক, ঠেলাওয়ালা, শিশু, বৃদ্ধ থেকে যে কেউ মুহূর্তের ভেতর অসাড় হয়ে যেতে পারেন, বুকের ভেতর প্রচণ্ড আতংকে কেঁপে উঠতে পারে, এবং ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা!! এবং এটি প্রমাণিত সত্য।!

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ওইরকম শব্দ করে গাড়ি চালানো কি কারণে দরকার?
বাংলাদেশ সরকারের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা কি এই ধরণের গাড়ি কে অনুমোদন করে?

যারা রাস্তাঘাটে ওইরকম করে গাড়ী চালান, তারা কি কাইন্ডলি ভেবে দেখবেন, আপনি কি ভয়ংকরভাবে মানুষ খুন করে চলেছেন? ভয়াবহভাবে। এবং ঠিক সেই মানুষ খুন করবার মুহূর্তে আপনি হয়তো অবলীলায় ঘেটি দোলাতে দোলাতে, মুখে শিস দিতে দিতে, মোলায়েম আলোতে গাড়ীর ভেতরে শ্রুতিমধুর শব্দে ইংরেজী গান শুনছেন, Ooh, Yeah
Oh yeah
Oh Life
Oh Life
I’m afraid of the dark…

ফর ইওর কাইনড ইনফরমেশন, উই আর অলসো এফ্রেইড অফ দ্যা ডার্ক, অ্যান্ড লাভ দিস লাইফ ইন দ্যা স্ট্রিট, আউট অফ সাচ অ্যা ডেমন কার…
ওহ ইয়াহ! দিস ইজ আওয়ার লাইফ!ডোন্ট এক্সপ্লয়েট ইট প্লিজ…
লেখক: সাদাত হোসাইন

No comments yet.

-যা কিছু বলার-