In The Mood For Love

By স্টিভ এরিকসন

হংকং; ১৯৬২। চো মো ওয়ান (টনি লিয়াং চু ওয়াই) এবং ছু লি ঝেন (ম্যাপি চিওয়াং ম্যানয়ুক)। চো এবং ছু পরিবার একই দিনে পাশাপাশি এ্যাপার্টমেন্ট এ উঠে। তাদের প্রথম প্রথম দেখাগুলো ছিল রীতিস্বর্বস্ব। আনুষ্ঠানিকতায় পরিপূর্ণ এবং চরম ভদ্রতামূলক। চো ও ছু এরা যার যার নিজ নিজ পরিবারে থেকেও ছিল বিচ্ছিন্ন। দু’জনই ছিল ভিন্ন পরিবারের। তবুও ধীরে ধীরে এক অনুদ্ধোধিত অনুভূতির উদ্ধোধন আবিষ্কার করে নিজেদের মধ্যে। গড়ে ওঠে এক অন্তরঙ্গতা। এক ঘনিষ্ঠ বন্ধন। রোমান্টিকতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও তার ছোট ছোট ক্ষনস্থায়ী মূহুর্ত গুলোকে এ চলচ্চিত্র জাগিয়ে তোলে প্রচন্ডভাবে। এর সুর? সেতো বেদনার সুরে সঙ্গীতময়। আর ফিল্মমান পর্যায় বিবেচনায় এতো এক নিখুঁত বিমূর্তকরণের নমুনা। আর সমাজে এর প্রভাব? মানের নিক্তিতে পরিমাপ করতে গেলে বলতে হয় বিগত দশকগুলোতে এ ম্যুভিটির ছিল এক স্টাইলিষ্টিক তীব্র প্রভাব। আরো ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বলা যায়- ফিল্মটি ওয়ং এর চমৎকার ক্যারিয়ার এর এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

একবিংশ শতাব্দীর আগমনের প্রারম্ভের দিকে ওয়ং কার ওয়াই ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হৃদয়গ্রাহী পরিচালক এবং ২০০০ সালের ‘ইন দ্যা মুড ফর লাভ’ হল তার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ছবি। পশ্চিমারা যেসব চলচ্চিত্রগুলোকে প্রথাগত, বস্তাপঁচা বলে বিবেচনা করত, ওয়ং তার সময়ের অন্যান্য পরিচালকের ন্যায়, ওগুলোকেই এক নতুন গ্ল্যামার ও আবেগতপ্ততা দিয়ে রঞ্জিত করেন। এ মূলত এক অনুপ্রাণিত করা। নতুন এক তাড়না সঞ্চার করা। স্তিমিত করা নয়। কিংবা নিস্তেজ মূঢ় হয়ে পড়া মনকে জাগ্রত করা। জন উ’ এবং সু হার্ক এর সিনেমাতে, সহিংসতার আড়ালে ছিল রোমান্টিকতা কিন্তু ওয়ং এর ছবিতে প্রেম বিষয়টি কখনই কেবল চিত্তবিনোদন হয়ে থাকেনি কিংবা কেবল উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলার মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে নি, অথবা কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্তের ক্ষণস্থায়ী গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে থাকে নি। এতে ছিল প্রভাব বিস্তারকারী দ্বন্দ্ব; আর অতি নাটকীয় বিষয়গুলোতে ওয়ং এর প্রেম গল্পগুলো হাস্য রসাত্মক, আর ব্যঙ্গ বিদ্রুপ তো দুস্প্রাপ্য। কারণ ছবিটি নির্মিত হয় এমন এক বিচ্ছিন্ন শহুরে এলাকায়, যেখানে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করার বিলাসিতার অবকাশ তাদের নেই। তাই বলা চলে, ভিন্ন আমেজ ভিন্ন স্বাদের সন্ধান যারা করে, এ ম্যুভি তাদের জন্য এক ভিন্নতার আকর।

ছবিটির মান বিচারে এ এক অন্যন্য অসাধারণ সৃষ্টি। তাই কেবল এর পূর্ণতা ও স্বার্থকতা বিচার করাটা অর্থহীন। এ ম্যুভিটি এসব প্রাথমিক বাছ বিচার ছাড়িয়ে আরো বেশ উর্ধ্বে।
In The Mood For Love_ 1 612_330
‘ইন দ্যা মুভ ফর লাভ’ ছবিটি নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল এবং স্বতন্ত্র। এটা এ কারণে যে, ছবিটিতে প্রাচীন গ্রীক ও রোমান শিল্পরীতির অনুসরণের পাশাপাশি ইতিহাস নির্ভর কিছু ভয়, আশঙ্কা ইত্যাদি অতি নাটকীয় উপাদান উপযুক্ত অনুপাতে ছায়াপাত করা হয়েছে। মূল চরিত্র হিসেবে নিযুক্ত করা দুই চরিত্রের অবস্থান হল পাশাপাশি এ্যাপার্টমেন্টে। তার একজন নায়ক চো মো ওয়ান (টং লিয়াং চু ওয়াই) আবির্ভূত হন একজন সাংবাদিক হিসেবে এবং নায়িকা হু লি ঝেন (ম্যাগি চিওয়েং ম্যান ইয়ুক) একজন কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে পর্দায় উপস্থাপিত হন। যার প্রথমজন পুরুষ এবং অপরজন নারী। উভয়েরই রয়েছে নিজ নিজ স্বামী স্ত্রী। তারা উভয়ে লক্ষ্য করল স্ব স্ব বিপরীত জীবন সঙ্গিনীগণকে। আবিষ্কার করে নতুন রূপে। যারা তাদের নিজ নিজ লাইফ পার্টনারকে বাদ দিয়ে আলাদা আলাদাভাবে গৃহত্যাগ করে একই সময়ে। চলে যায় শহরের বাইরে। অজানা কোন এক স্থানে অবস্থান করে । একই সময়ে অনুপস্থিত থাকে, না ঘরে, না শহরে। তাদেরকে এভাবে একা রেখে যাওয়াই তাদের নতুন এক সম্পর্কের সুযোগ করে দেয়। সৃষ্টি করে দেয় পথ। তৈরি করে পরিবেশ। এভাবে প্রথম জনের পরদারগামিনীর ও দ্বিতীয় জনের পরদারগামীর গৃহমধ্যে রেখে যাওয়া দু’জন পার্টনার/সঙ্গীর নিজেদের সম্ভাব্য উপায়ে শীঘ্রই প্রণয়রঙ্গে মেতে ওঠে। কিন্তু এ আশ্চর্য উপায়। নিজেরা পরস্পর প্রতিজ্ঞা করে “আমরা তাদের মতো হবোনা।”
এমনকি যখন তারা হোটেলে রুম নেয়। কিছু ভোগ করার নিমিত্তে নয়। বরং অন্যান্য কাজে কর্মে তারা যা কল্পনা করে সেই ইন্দ্রিয়কে আরো প্রসারিত করতে। যেমন- চো এর পত্রিকার জন্য নিবন্ধ লেখা। নিষিদ্ধ প্রণয়জাত আলাপচারিতার মহড়া দেয়া, তীব্র স্পন্দনজনিত ইঙ্গিত আদান-প্রদান করা ও তাতে সাড়া দেয়া ইত্যাদি চলতে থাকে হং কং এর চিন্তার সংকীর্ণ রাজ্যের নির্জনতার ছন্দময় সিড়িতে। চলতে থাকে করিডোরে। এভাবে মুভিটির বাঁকে বাঁকে ক্রিষ্টোফার ডাইলে এবং মার্ক লী পিং বিন এর নেয়া শটে মনোমুগ্ধকরভাবে। যারা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না কার গুপ্ত বাসনাকে প্রথমে সুপ্ত অবস্থা থেকে প্রকাশিত করা হবে। কিংবা প্রকাশ করা উচিত। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভঙ্গুরতা ও নৈতিকতার অসারতার বশবর্তী হয়ে তারা নিজেরাই ঐ বাধাগুলো দ্বারা বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল। যে বাধাগুলো তারা ঐ জুটির উপর আরোপ করেছিল। প্রথম কার বাসনা উন্মোচিত করা হবে। তারা দুলছিল সিদ্ধান্তহীনতার দোলাচলে। নৈতিকতার তাড়নায় তাড়িত হয়, তবে পরাস্ত হয়নি। যায়নি নতি স্বীকার বাধ্য হওয়ার পর্যায়ে। এ ব্যাপারটাই রোমাঞ্চকাতর মিটারের পারদকে সবসময় রাখে উর্ধ্বমুখী।
যৌন তীব্র আকাখা পূর্ণরূপে আর্বিভূত হলেও সেই যৌন তাড়না বশীভূত করা কিংবা সে যৌন প্রবৃত্তির অবদমন করা যেকোন যৌন উত্তেজক কিছুর চাইতে কামোদ্দীপক। অনেক মানুষের মত চো এবং ছু দু’জনই প্রতারিত। তারা নিজেরা নিজেদের করে দোষারোপ, নিজেদের করে অবজ্ঞা। এই বলে যে, যা তাদের প্রাপ্য ছিল তা থেকে তারা বঞ্চিত। পুরো ফিল্পটির তিন ভাগের প্রথম ভাগে একটি মারাত্মক দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। নায়িকা ছু এতই একাকীত্ব ও বেদনার্ত যে তার একাকীত্ব তাকে তার একবারে পাশের বাড়ীতে বাস করা নারীর নিকট নিয়ে যায়। কিন্তু তখনো নায়িকা সন্দেহ করতে পারে না যে, এই প্রতিবেশিই তার স্বামীকে তার কাছ থেকে গোপনে নিয়ে যায়। কিংবা বিষয়টি নায়িকা কি তখনো আঁচ করতে পারে? যখন রুম থেকে বেরিয়ে আসে? দরজা রীতিনুযায়ী বন্ধ হওয়ার পর সে শুনতে পায়- ঐ প্রতিবেশি মহিলার এক ক্ষীণ শব্দের মন্তব্য। সে মন্তব্য তাকে পরামর্শ দেয় সন্দেহ করতে কিংবা এরূপ কিছু বুঝে নিতে যে, তার স্বামী ঐ একই সময়ে, ঐ একই রুমে অবস্থান করতে পারে। এক তীব্র দোলাচলের দোলায় সে হয়ে পড়ে সুস্থির, পাথরের ন্যায়। ভেতরে মস্তিস্কের নিউরনগুলো দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ে, সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে।
In The Mood For Love_ 2 612_300

যে কথোপোকথন ঠিক কয়েক কদম দূরে হয়ে গেল। ছু এখনও তা তার হৃদয়ে পুরোপুরি স্থান দিতে পারে নি। তবে দেয়ালের মধ্য দিয়ে আসা অস্পষ্ট স্বর দুটোর একটি কি সে চিনতে পেরেছে? এই যে দ্বিধা, তা ছবিটির গ্ল্যামার আরো বাড়িয়ে দেয়। ঐ দিনই তারা পাশাপাশি এ্যাপার্টমেন্ট এ উঠে। তাদের আসবাবপত্র ও টুকটাক জিনিসপত্রগুলো দুই পরিবারের মধ্য এমনভাবে মিশে গেছে যে, যা থেকে তারা তাদের জীবনও অনুরূপভাবে কতটা দ্রুত মিশে যেতে পারে তা প্রত্যাশা করা যেতে পারে। এমনকি তাদের ঐ নতুন ঘরে অবস্থান শুরুরও আগে অথবা মুভিটি শুরুর আগে! আসলে বলতে হয়, এ এমন এক ফিল্ম যেখানে ধারণা, দৃশ্যপট, ঘটনাগুলো ঘুরে ঘুরে আবার ঐ কেন্দ্রে চুম্বকের মত ফিরে আসে। যেখানে আড়াআড়ি ও মুখোমুখি থাকা গৃহগুলো- ভাগ্য কর্তৃক নির্ধারিত সামনা সামনি ফটকের নিয়তিকে সমকক্ষতার রূপ দেয়। তবে কী এ কথা বলা যায়, নায়ক চো এবং নায়িকা ছু নিয়তি নির্ধারিত প্রেমিক প্রেমিকা? তবে তারা কী ভয় বা সততার বশবর্তী হয়ে ঐ দুষ্প্রাপ্য সুযোগের নিন্দা করবে? জীবন যে সুযোগ তাদের অপর্ন করেছে তা প্রত্যাখ্যান করবে? কিংবা সুখের এই দুষ্প্রাপ্যতম সুযোগ গুলোর একটিকে হারাবে?
পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ওয়ং এক পর্যায়ে মনস্থির করেন যে, তিনি “ইন দ্যা মুড ফর লাভ” ছবিটির লোকেশন হিসেবে বেইজিং পছন্দ করেছিলেন কিংবা হংকং ছাড়া অন্য কোন স্থান পরিকল্পনা করেছিলেন। এ এক বড় রহস্যময় সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়। মনে হয় বোধাতীত বিষয়। এই তো নিয়তির নমুনা। মাঝে মাঝে নিয়তিই চালকের আসন গ্রহণ করে; আমরা যখন কিংবা যেখানে ব্যর্থ। কিন্তুতার অভিষেক ছবি ১৯৮৮ ‘এ্যাজ টিয়ারস্ গো বাই’ সহ অন্যান্য ছবিগুলো তত ভালো মান কিংবা মাপের ছিল না। কিন্তুনিয়তিই হয়ত তাকে এরূপ স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেইজিং এর বিকল্প হিসেবে হংকংকে বাছাই করতে তাড়িত করে। তিনি আঞ্চলিক ভাষা ক্যান্টোনিজও শিখতে পারেননি। যিনি বেড়ে ওঠেছেন এক সীমাহীন সিদ্ধান্তহীনতায়। একদিকে প্রাচ্য অপর দিকে পাশ্চাত্য। একদিকে পুঁজিবাদ অপর দিকে সাম্যবাদ। একদিকে স্বাধীনতা আরেক দিকে নিপীড়ন। তিনি শৈশব থেকে কৈশোর এ পদার্পণ করেন এসব দেখতে দেখতে।
[embedplusvideo height=”420″ width=”612″ editlink=”http://bit.ly/MWhpYG” standard=”http://www.youtube.com/v/BnFjSHQFVkA?fs=1″ vars=”ytid=BnFjSHQFVkA&width=612&height=420&start=&stop=&rs=w&hd=0&autoplay=0&react=1&chapters=&notes=” id=”ep8998″ /]

আশ্চর্য কিছু বিষয় হল মুভিটির ছোট খাট কিছু বিষয়, তাচ্ছিল্য করার মত হলেও আসলে বহন করে এক সুগভীর তাৎপর্য। ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয় কিংবা পুরোনা কিছু প্রতিজ্ঞা সম্পাদনের জন্য এ্যালার্ম দেয়। উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে ঐ হোটেলের রুম যেখানে নায়ক-নায়িকা খুঁজে পায় নীড়। যার নম্বরটি ছিল ২০৪৬। ভাল ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ২০৪৬ হল একটি সংখ্যা। যা একটি অনাগত বছর বোঝায় আজও আসেনি। করে নি অতিক্রম। ঠিক তার পঞ্চাশ বছর পূর্বের বছর হল ১৯৯৭।
ঐ সময় চীন ও ব্রিটিশ এর মধ্যে এ চুক্তি হয়। চুক্তিটি মূলত এক প্রতিজ্ঞা। তৎকালীন সময় ক্যাপিটালিজম ও কমিউনিজম এর দ্বন্দ্ব ছিল প্রকট। আর ক্যাপিটালিজম বিস্তার লাভ করছিল প্রবল প্রতাপে। সেই চীন- ব্রিটিশের ১৯৯৭ সালের প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী- হংকং এ ১৯৯৭ থেকে ক্যাপিটালিজম চলবে এবং ২০৪৬ সালে তা শেষ হবে। যা ছিল ব্রিটিশের সাথে তৎকালীন চীনের প্রতিজ্ঞা। অর্থাৎ ৫০ বছর ধরে চলবে। ঐ ৫০ বছর অর্থাৎ রুম নম্বর ২০৪৬ এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ইঙ্গিত বহন করে। এ বড় এক চমকপ্রদ দিক যা ম্যুভিটিকে ঐতিহাসিক সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
In The Mood For Love_3 612_316
সার্বিক ভিন্নতা, সমাজের ধারায় থেকেও সামাজিক নয় এরূপ কিছুর বহমানতা, ম্যুভির গতানুগতিক ধারায় থেকেও নব্য ধারার উপাত্ত লালন- এসব কিছু ম্যুভিটির গুণগত মানকে করে সমুন্নত। দর্শকদের করে মোহিত, আপ্লুত।

No comments yet.

-যা কিছু বলার-