গলফ

গলফ হল বল ও ক্লাবের সূক্ষ্ম দক্ষতার খেলা, যেখানে প্রতিযোগীরা (গলফার) নানা ধরনের ক্লাব দিয়ে সবচেয়ে কমবার মেরে গলফ বলটি গলফ মাঠের (গলফ কোর্স) প্রত্যেক গর্তে ফেলার চেষ্টা করে। বল জাতীয় খেলাগুলির মধ্যে গলফ এমন একটি খেলা যেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট আকারের মাঠ নেই। প্রতিটি গলফ মাঠের আলাদা আলাদা আকার আছে। তবে সাধারণতঃ গর্তের সংখ্যা ৯ বা ১৮টি হয়ে থাকে।গলফের নিয়মাবলী অনুসারে গলফের সংজ্ঞা হল, “টি এলাকা থেকে দন্ডের সাহায্যে বল এক বা একাধিক বার মেরে গর্তে নিয়মানুসারে ফেলা।” যে সব গলফ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী সবচেয়ে কমবার বল মেরেছে তাকে স্ট্রোক প্লে বলা হয়। আর যে সব গলফ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী বেশিরভাগ গর্তে খেলার সময় সবচেয়ে কম নম্বর তুলেছে তাকে ম্যাচ প্লে বলে।
ইতিহাস:
গলফের উদ্ভব নিয়ে প্রচুর বিতর্ক আছে। কোনো ঐতিহাসিকের মতে প্রাচীন রোমান খেলা পাগানিকা, যাতে অংশগ্রহণকারীরা একটি বেঁকানো লাঠি দিয়ে চামড়ার বল মারতে হত, থেকে গলফের উদ্ভব। খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতকে রোমানদের সাথে এই খেলা গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে ও আস্তে আস্তে আজকের গলফের চেহারা নেয়। অন্যদের মতে, অষ্টম ও চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে চীনের চুইওয়ান (“চুই” মানে মারা ও “ওয়ান” মানে ছোট বল) খেলাই গল্ফের পূর্বসূরি। মধ্যযুগে এই খেলা ইউরোপে আসে। ইংল্যান্ডের ক্যাম্বুকা বা ফ্রান্সের ক্যাম্বট আর একটি প্রাচীন খেলা যার সাথে গলফের সাদৃশ্য আছে। পরে এই খেলা “পেল মেল” নামে ছড়িয়ে পড়ে। কারো মতে পারস্যের চুঘান থেকে গলফের সৃষ্টি। ওদিকে হল্যান্ডের লোনেনে পঞ্চম ফ্লোরিসের খুনির ধরা পড়ার দিনটি মনে রাখতে কোলভেন নামে বাঁকা লাঠি ও বলের একটি বার্ষিক খেলা প্রচলিত ছিল ১২৯৭ সাল থেকে।
তবে বহুল স্বীকৃত মত অনুযায়ী, আজকের গলফেরর উদ্ভব দ্বাদশ শতাব্দীর স্কটল্যান্ডে। সেখানে আজকের সেন্ট অ্যান্ড্রূজের পুরোনো মাঠে মেষপালকেরা খরগোশের গর্তে পাথর লাঠি দিয়ে মেরে ঢোকাতো।
golf ireland

সিদ্দিকুর রহমান: বাংলাদেশি গলফার:-
১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২০ নভেম্বর সিদ্দিকুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন মাদারীপুরে। পারিবারিক নাম মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান। তাঁর বাবার নাম আফজাল হোসেন এবং মায়ের নাম মনোয়ারা বেগম। পরিবারের চার ভাইয়ের মধ্যে সিদ্দিকের অবস্থান তৃতীয়। জন্ম থেকেই প্রচন্ড অভাবের মধ্যে বেড়ে উঠেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপর বাবা আফজাল হোসেন পুরো পরিবার নিয়ে পেটের দায়ে এসে উঠেছিলেন ঢাকার খানিক বাইরে ধামালকোটের বস্তিতে। সেই সন্ত্রাসময় স্থানটিতে বেড়ে ওঠতে ওঠতে সিদ্দিক একসময় পাশের বাড়ির এক ছেলের সাথে চলে যান ঢাকাস্থ কুর্মিটোলায় অবস্থিত সেনাবাহিনীর গলফ ক্লাবে। সেখানে তিনি ‘বলবয়’ হিসেবে বল কুড়ানোর কাজ করতে শুরু করেন, তখন তিনি পড়তেন দ্বিতীয় শ্রেণীতে। এভাবে তাঁর সামান্য কিছু আয় (৩০ টাকার মতো) হতে থাকে। আর পাশাপাশি কাছ থেকে দেখার সুযোগ তৈরি হয় এই সাহেবী খেলার।
একসময় ‘বলবয়’ থেকে ‘ক্যাডি’ পদে পদোন্নতি হলো তাঁর। এবারে তিনি খেলোয়াড়দের পেছন পেছন তাদের সরঞ্জাম বহন করার এবং টুকটাক সহায়তা করার সুযোগ পান। আর এভাবে এই খেলার পোকা মাথায় ঢুকে যায় তাঁর। তিনি তাঁর স্বল্প সামর্থ দিয়ে এক লোহার দোকানে গিয়ে লোহার রড দিয়ে গলফ ক্লাবের মতো একটা কিছু তৈরি করে নেন। পড়ালেখার পাশাপাশি ক্যাডি’র দায়িত্ব পালন করেও সিদ্দিক তখন এই আনকোরা ক্লাব দিয়ে গলফ চর্চা করতেন।
২০০০ সালের দিকে বাংলাদেশের গলফ ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের উদ্যোগে দেশে প্রতিযোগিতামূলক গলফে বলবয়-ক্যাডি হয়ে আসা সুবিধাবঞ্চিত গলফারদের সুযোগ হয়। আর সেই সুযোগে কোচের অধীনে শুরু হয় সিদ্দিকুর রহমানের অনুশীলনও। তখন তাঁর আগ্রহ এবং ধৈর্য্য ছিল আর-সবার থেকে ঢের বেশি। একসময় এই আগ্রহ আর ধৈর্য্যের ফলও পেতে শুরু করলেন। সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে তিনি জিততে শুরু করলেন: একে একে ১২টি অপেশাদার গলফ টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতে ফেললেন সিদ্দিক।
অপেশাদার গলফে তাঁর সাফল্য তাঁকে টেনে নিলো পেশাদার গলফের দিকে এবং ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে শুরু হলো তাঁর পেশাদার গলফের জগত। যথারীতি সেখানেও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখলেন সিদ্দিক। ২০০৮ ও ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ভারত ও বাংলাদেশ সার্কিটের ৪টি পোশাদার শিরোপা জিতলেন সিদ্দিক।
সিদ্দিকুর রহমান ১২টি অপেশাদার গলফ টুর্নামেন্ট জয় করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশে জিতেছেন ৫টি, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় জিতেছেন ২টি করে, আর একটি জিতেছেন ভারতে। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বাংলাদেশী গলফার হিসেবে সুযোগ পান এশিয়ান ট্যুর-এ অংশ নেয়ার। এবং এ বছরই ব্রুনাই ওপেন শিরোপা জিতে নেন। একই বছর তিনি এশীয় গলফারদের র্যা ঙ্কিংয়ে ৯-তে উঠে আসেন। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এশিয়ান ট্যুর-এ স্থান পাবার পর পরই ১ আগস্ট প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে তিনি জয় করেছেন এশিয়ান ট্যুর-এর শিরোপা। ২০১৩ সালের নভেম্বরে হিরো ইন্ডিয়া ওপেন গলফ টুর্নামেন্টে তিনি চ্যাম্পিয়ন হন।

No comments yet.

-যা কিছু বলার-