“ Rififi” (একটি ফরাসী ছায়াছবি)

আমেরিকায় ‘ব্রুট ফোর্স’ ও ‘দি নেকেড সিটি’র মত ধ্রুপদী অপরাধ চলচ্চিত্র তৈরীর পর কালোতালিকাভুক্ত পরিচালক জুল ভাসিন প্যারিস চলে যান এবং তাঁর সেরা ছবি তৈরীতে হাত দেন। আলোর নগরী প্যারিসে এটি চার দন্ডিত অপরাধী কর্তৃক সংঘটিত ডাকাতির এক রোমাঞ্চকর কাহিনী। “ Rififi”অনিশ্চয়তা, নিষ্ঠুরতা ও কৌতুকের মিশ্রণে তৈরী একটি চূড়ান্ত ডাকাতির চলচ্চিত্র- যা আন্তর্জাতিকখ্যাতি অর্জন করে এবং ভাসিন কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালকের পুরস্কারটি পান। এই চলচ্চিত্রটি পরবর্তী কয়েক দশক রোমাঞ্চকর ডাকাতির চলচ্চিত্র নির্মাণে পথিকৃৎ হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে।

movie_review_rifiti_content1

১৯৫৫ সালে প্যারিসে নির্বাসিত আমেরিকান পরিচালক জুল ভাসিন নিজের সমস্ত মেধাশক্তি দিয়ে এই নিখুঁত চলচ্চিত্রটি তৈরী করেন। এক সময়ের উদীয়মান পরিচালক ভাসিন যিনি এমজিএম এর সংগে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সস্তা দ্বিতীয় শ্রেণীর ছবি নির্মাণ করছিলেন, এই ছবিটি তার দায়মোচন হিসেবে আসে। (“ওইগুলো ছিল জঘন্য এবং আমার জন্য কেবল দুর্ভাগ্যজনক দায়গ্রস্ত্মতা”-পরবর্তীতে তিনি তাঁর ওই কাজগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন)। ‘হাউস অব আন-আমেরিকান একটিভিটিজ কমিটি’র ভ্রান্ত ধারণাবশতঃ হস্তখেপের কারণে তাঁর পরিচালক জীবনে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। তাঁকে কম্যুনিস্টআখ্যায়িত করার পর তিনি ইউরোপে পালিয়ে যান এবং বিভিন্ন ফরাসী ও ইতালিয় কোম্পানীর ছবি পরিচালনার চেষ্টা করেন। কিন্তু হলিউড স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে যেসব ছবিতে ভাসিন এর নাম যুক্ত থাকবে সেগুলো প্রদর্শনের জন্য নিষিদ্ধ করা হবে। ১৯৫৫ সাল নাগাদ পরিস্থিতি অসহ্য হয়ে উঠে। কর্মবিহীন অর্থবিহীন ভগ্নহৃদয়েতিনি কাজ পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তখনই একটি ফরাসী সংস্থা “ Rififi” পরিচালনার জন্য যোগাযোগ করে। ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাঁর গভীর উদ্বেগ সত্ত্বেও তিনি কাজটি গ্রহণ করলেন। যে ছবিটি ভাসিন নির্মাণ করেন সেটি প্রশ্নাতীতভাবে তাঁর প্রিয় কাজ হয়ে উঠে। ছবির গল্পে নতুন গজিয়ে উঠা ব্যাংক ডাকাত টনি লা ষ্টিফানয় প্যারিসের চমৎকার পটভূমিতে একটি অসাধারণ দুঃসাহসিক ডাকাতির নেতৃত্ব প্রদান করে। ঝলমলে সাজানো এবং শিল্পকৌশলে সমৃদ্ধ “ Rififi” বাস্ত্মবিকই একটি উঁচুমানের কাজ। “ Rififi” সাফল্যের মূলে যা আছে তা হলো ছবি তৈরীর সকল দিকই সমান ফুটে উঠেছে। হীরকখন্ডের মত ছবির প্রতিটি দিকই সমভাবে উদ্ভাসিত। অভিনয় সম্পর্কে বলতে গেলে প্রধান চরিত্র জাঁ সার্ভেই এর ক্ষণিক উপস্থিতি এবং পারলো ভিটা ছদ্মনামে সিন্দুক ভাঙ্গার অভিনয়ে ভাসিনের নিজের ভূমিকা অনবদ্য। ক্যামেরার কাজ খুবই উৎকৃষ্ট, বিশেষভাবে রাত্রিকালীন সটগুলো; যেমন রাস্তারনিয়ন আলোর বিপরীতে টনীর হ্যাটের সূক্ষ উপস্থাপন। বিখ্যাত সুরকার জর্জ অরিক প্রদত্ত সুর যথাযথ সংযত বিষণ্ন মাঝে মাঝে নৃত্যের আবহ সৃষ্টি করে।

[embedplusvideo height=”420″ width=”612″ editlink=”http://bit.ly/1aPka8P” standard=”http://www.youtube.com/v/a9bciTbt6l8?fs=1″ vars=”ytid=a9bciTbt6l8&width=612&height=420&start=&stop=&rs=w&hd=0&autoplay=0&react=1&chapters=&notes=” id=”ep4608″ /]

কহিনীটি অর্থনৈতিক বিচারে আশ্চর্যজনক- তিনটি সংক্ষিপ্ত অংকএকটি অপেরার উৎসর্গ দিয়ে শুর হয়ে চমৎকার বিন্যাস এবং রোমাঞ্চকর পরিণতি। সেটগুলো প্রখ্যাত ডিজাইনার আলেকজান্ডার ট্রনার (যিনি Childrean of Paradise এর জন্য কাজ করেছিলেন) ভাসিনের নির্বাচিত রাস্তারলোকেশনের সংগে খাপ খাইয়ে নির্মাণ করেন। রীতি মোতাবেক অপরাধীদলের নৈশক্লাবের অভ্যন্তরীন সাজসজ্জা বেশ মনোরম, স্থাপত্য কলার প্রয়োগে বলরুম থেকে অফিসকক্ষ পর্যন্ত সিঁড়ির পর সিঁড়ি দিয়ে সাজানো- যেখান থেকে পেছনের দরজা দিয়ে স্বপ্নময় পটভূমি দৃশ্যগোচর হয়। শুধুমাত্র ঝলমলে প্যারিসের লোকেশন, যেমন রেলস্টেশন এবং বিভিন্ন অলিগলি ট্রনারের সেটের উজ্জ্বলতাকে কিছুটা ম্লান করে দেয়। তথাপি, এমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছবিতেও কিছু একটা সবকিছুর উপরে বিশিষ্ট হয়ে উঠে। “ Rififi” সেধরনের ছবি যার মধ্যে রয়েছে একটি বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য দৃশ্য। The Magnificent Ambersons এর গ্র্যান্ড হল বলনাচ অথবা Pickpocket-এ ঔষধ ছিটানোর প্ল্যানের পেছনে ধাওয়ার দৃশ্যের মত “ Rififi” র কেন্দ্রে রহস্যময় নিঃশব্দ ডাকাতির দৃশ্যটি অসাধারণ। দরজা ভেঙ্গে রুমে প্রবেশ, এলার্ম নিষ্ক্রিয়করণ, সিন্দুক ভাঙ্গা, ঘড়িতে সময় দেখা এবং একে অন্যের প্রতি ইশারা করার মত কাজে অপরাধীদল যখন ব্যস্তভাসিন শ্বাসরুদ্ধকর এই ৩৩ মিনিটের জন্য শব্দগ্রাহক যন্ত্র বন্ধ করে দেন। পিনপতন নীরবতা, কোন সংলাপ নেই, পিয়ানোর সামান্যতম ঝংকারেও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার মত অবস্থা। নির্লজ্জ নকলনবিশরা এধরনের দৃশ্য অনেকবার নকল করার চেষ্টা করেছে; কিন্তু এমন নিখুঁতভাবে কেউ করতে পারেনি। সিন্দুক ভাঙ্গার যন্ত্রপাতি, বেয়ে নামার জন্য গিঁট পাকানো দড়ি, দলের লোকদের বিশেষ ইশারা ভাষা ইত্যাদির চিত্র ক্যামেরাসটের মাধ্যমে অত্যান্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু এটা কেবল সংঘবদ্ধ লোকগুলোর সহজ ভাবমূর্তি যা সবছিুকে একত্রিত করে। ছবিটি অপরাধ সম্পর্কে হলেও “ Rififi”র কেন্দ্রে রয়েছে কাজের জয়গান, নীরস একঘেয়ে খাটুনি নয়- খলিল জিবরানের কাব্যিক বর্ণনায় ‘ভালবাসা দৃশ্যায়িত’। এই বিশেষ ৩৩ মিনিট আমরা আমাদের নায়কদেরকে প্রত্যাশা মতই একসংগে কাজ করতে দেখি।

movie_review_rifiti_content2

এবৎসর ছবিটি দেখার পর আমি ৮৮ বৎসর বয়সী ভাসিনের সংগে ফোনে কথা বলি। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি ছবিটি তৈরীর সময় তিনি কি জানতেন কী সুন্দর একটি ছবি তিনি তৈরী করতে যাচ্ছেন। অপরপ্রান্তে আমি তাঁর দুর্বোধ্য মুচকি হাসি আঁচ করতে পারছিলাম। তিনি বললেন, “আমি বাস্তবিকই জানতাম না এটা কী হবে, আমার সমস্ত মনসংযোগ কাজের মধ্যে ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতাম আর আমার দলের ক্রুদের সংগে উপভোগ করতাম।”

No comments yet.

-যা কিছু বলার-