তিতাস একটি নদীর নাম : না ফেরার নদী

(লেখক: আড্রিয়ান মার্টিন)

অতীতের গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিগুলোর ভেতর নতুন করে ঢুকলে চলচ্চিত্রের ইতিহাস নতুন করে অবলোকন করার প্রেরণা পাওয়া যায় – বিশেষ করে যখন জাতীয় চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ আসে – যা তার্কিক সংঘর্ষে রূপ নেয় : যদি আমরা কেবল বহু দশক আগে জানতাম যে মিকিও নারুসে ইয়াসুজিরো ওজুর চেয়ে শ্রেয়তর ছিলেন, বরিস বার্নেট সের্গেই আইসেনস্টাইনের চেয়ে ভালো ছিলেন, আর ঋত্বিক ঘটক সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে মহত্তর ছিলেন! বাস্ত্মবে এমন ঘোর বিরোধী অবস্থানের প্রয়োজন নেই, আর আমাদের মূল্যায়নকে পরিশুদ্ধ করতে বিশেষ করে ঋত্বিক আর সত্যজিতের মধ্যে কোনো বিরোধিতা আমরা করবো না – যারা নিজেরা পরস্পরের কাজের প্রশংসা করতেন।
কিন্তু এই দুই মহান শিল্পীর মধ্যে সহজেই একটি পার্থক্য টানা যায়। সত্যজিতের সৃষ্টি ছিল জনপ্রিয় ভারতীয় বিনোদন (যেমন বলিউডের বিনোদন) থেকে পৃথক ‘শৈল্পিক চলচ্চিত্র’ যা ছিল মানবতাবাদ ও বাস্তবতাবাদ দ্বারা বিশেষায়িত এবং যা সে যুগে অনায়াসে বিশ্বভ্রমণ করেছিল। বাঙালি ভারতীয় ঋত্বিক ঘটক ছিলেন আরও প্রান্তসীমায় : এই শৈল্পিক চলচ্চিত্রের আঁভা-গার্দ রূপে। যদিও ঋত্বিক সারা জীবন জনপ্রিয় সংস্কৃতির জগতে ভ্রমণ করেছিলেন, তিনি কখনও তাঁর জীবনে শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের মাঝে গোত্রগত জনপ্রিয়তার চেয়ে ঢের বেশি কিছু অর্জন করেননি, এবং তিনি নিজ দেশের বাইরে খুব কম স্বীকৃতিই পেয়েছিলেন।
ঋত্বিক আটটি ফিচার ফিল্ম আর অনেকগুলো স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র সম্পূর্ণ করেছিলেন – যেগুলো চিত্তকে নাড়া দেয়, আর সেগুলো সত্যজিতের ফিল্মের চেয়ে অনেক বৈপ্লবিক রকমের আধুনিক। তিনি তার কাজে তৈরি করেছিলেন ক্রমাগত ধাক্কার তীব্র বুনন, আর এর অনেক কারণের একটি ছিল ব্যক্তিগত। বিশেষ করে তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র অযান্ত্রিক (১৯৫৮) এর সময় থেকে তিনি পানাসক্ত হয়ে পড়েন, আর গভীর হতাশা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের যুগের আঘাতে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন রোগে ভোগার পর ১৯৭৬ সালে পঞ্চাশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। এসব সত্য চলচ্চিত্র শিল্পী হিসেবে তাঁর অর্জনের সাথে সম্পর্কিত ছিল না। বস্তুত কোনো পানাসক্ত ব্যক্তির মেজাজের ভেতর এমন কিছু আছে যা একথা ব্যাখ্যা করে কেন ঋত্বিকের টিকে থাকা শিল্পসৃষ্টি এতো প্রাসঙ্গিক। তিনি সহসা হয়ে উঠেছিলেন এক অতি মেধাবী যুক্তিবাদী আর এক পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন আবেগপ্রবণ লোক আর মেলোড্রামার জগৎ যা ক্রমাগত হিস্ট্যারিয়ার দিকে ঠেলে দেয় তাঁকে পথ করে দিয়েছিল ছায়াছবির জগতে বাংলার ঘাতপ্রতিঘাতময় ইতিহাসের পূর্ণ রূপায়ন ঘটাতে।
তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), ঋত্বিকের শেষের আগের আর সবচেয়ে ভালোভাবে স্মরণ করা ছবি, তা “চিরদিনের বাংলার অসংখ্য শ্রমজীবীর শ্রমের” প্রতি উৎসর্গীকৃত। কিন্তু ঋত্বিকের ছবিতে কি চিরন্ত্মন কিছু আছে? তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে স্থান, সম্প্রদায়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ধীর, বেদনাকর অবক্ষয়ের চিত্র আছে; তাঁর চরিত্রগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে, ঘুরে বেড়ায়, মানসিক পীড়ায় জর্জরিত হয়। এমন কি, প্রমত্ত নদী তিতাসও যেন সবকিছুর বিচূর্ণনের ফলে “অদ্ভুত আচরণ করা” শুরু করে (ফিল্মটিতে একজন এভাবেই বলে); অমোচনীয় বেদনায় দীর্ণ একেকটি দৃশ্যপটে ঋত্বিক এর ক্রমাগত শুকিয়ে যাওয়া দৃশ্যপট দেখান ……
কিন্তু যদিও ঋত্বিক জীবনযাত্রার বিষণ্ন চিত্র উপহার দেন – এক্ষেত্রে তিতাস-তীরবর্তী গোকান্নঘাট গ্রামের মৎস্যশিল্পের ছবি – কিন্তু তিনি নস্ট্যালজিক কিংবা আবেগপ্রবণ নন। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো ব্যক্তিগত কিংবা ক্ষুদ্র-সম্প্রদায়গত (যেমন – ই-ফ্ল্র্যাট, ১৯৬১) ও সামাজিক (যেমন – তাঁর প্রথম ছবি, নাগরিক, ১৯৫২) উভয় ক্ষেত্রে নাট্যরূপদান movie_review_titas_ekti_nodir_naam_content
উন্নীতকরণে উৎসুক ছিলেন। সিনেমাই তাঁর দর্শনের সঠিক বাহক বলে তাঁর কাছে প্রতিভাত হয়েছিল।

যা হোক, ১৯৭৩ সাল নাগাদ সমাজতান্ত্রিক সংস্কারের পরিকল্পনা যা ঋত্বিকের তরুণ, প্রাপ্তবয়স্ক সংবেদনশীলতাকে লালন করেছিল তা একটি জটিল, প্রায়শঃ প্রতিশ্রুতির বিভ্রান্তিকর মিশ্রণ – তিনি সর্বদা তাঁর বিশ্বাসকে “কাজের” সিনেমায় প্রচার করতেন, তাঁর স্বপ্ন ছিল কোনোভাবে একটি শ্রেয়তর জগতের সেবা ও স্বপ্নকে সহায়তা করা – আর ছিল অসন্তোষ। এই অম্ল-মধুর মনোভাব, যা তাঁর পরবর্তী কাজের তুলনায় অদ্ভুততর, নিঃসন্দেহে তাঁর চিন্তাকে উস্‌কে দিয়েছিল, আর তাই হয়েছিল তিতাস একটি নদীর নাম শেষ করার কিছুকাল পরই। যে ফিল্ম এই শিক্ষা দান করে যে “ইতিহাস নির্দয়” আর তিনি যে জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন সেখানে “সব হারিয়েছে, কিছুই নেই”। এটি ছিল না ফেরার নদী।
ঋত্বিকের জীবন ছিল ঐতিহাসিক আঘাতে দীর্ণ, আর এই আঘাত তাঁর সকল মাধ্যমে কাজের সংবেদনশীলতা ও সারমর্মের ভিত্তি ছিল, যেমন – নাটক, উপন্যাস ও কবিতা লেখা (তাঁর Story নামের গল্প-সংকলন ২০০২ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়) আর চলচ্চিত্র নির্মাণ। তিনি কৈশোর কাটান পূর্ববঙ্গে, আর চল্লিশের দশক জুড়ে প্রত্যক্ষ করেন ধারাবাহিক সংকট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ; ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ; বহুসংখ্যক দাঙ্গা, ধর্মঘট ও বিদ্রোহ; ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন; আর চূড়ান্ত্মভাবে, ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের দেশবিভাগ। ব্রিটিশ ভারত সাম্রাজ্যের অবসান হওয়ার পর, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ ভারতকে দুটি খন্ডে বিভক্ত করে: পাকিস্ত্মান ডোমিনিয়ন (মুসলমান অধু্যষিত পূর্ববঙ্গ যার অংশ হয়) এবং ভারত ইউনিয়ন (যাতে হিন্দুপ্রধান পূর্ববঙ্গ ঢোকে); এটি মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে ছিন্নমূল করে, অনেকের সেই ঘটনার ক্রমে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। ঋত্বিক তিতাস একটি নদীর নাম ছবির শুরুর দিকের শিরোনামগুলো আমাদেরকে সাদামাঠাভাবে বাংলার ঝড়ো ইতিহাসে থাকা নামহীন, প্রায়শঃ বিস্মৃত মানুষের কথা বলে।
দেশভাগ: এই শব্দটাই ঋত্বিকের ছবির প্রতীক হিসেবে কাজ করে। কখনও কি কোনো চিত্রনির্মাতা এতোটা তীব্র ও স্থির মন নিয়ে ভাঙ্গন, ভিটেমাটি ত্যাগ ও ভঙ্গুরতার গ্রহণযোগ্য বৈচিত্র্যের ওপর আলোকপাত করেছেন? আর শুধুই অতিবিস্তৃত সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ বা তাৎক্ষণিক প্লটের ওপর ভিত্তি করে নয়; ঋত্বিক একই সাথে ভঙ্গুরতার হৃদয়বিদারী চেতনাকে তাঁর উঁচুমানের ফ্রেমে, সুর ও শব্দের বৈপ্লবিক প্রয়োগে, আর সর্বোপরি তাঁর তীব্র, অতি-আধুনিক নবায়নের টেকনিক দ্বারা এটি করেছিলেন। কত ঘন ঘন ঋত্বিকের ছবির ভেতর ছবি, সুর ও অঙ্গভঙ্গির সমাপ্তি ঘটে, যা আমাদের মনোযোগ থেকে চু্যত হয়? বস্তুতঃ, যা কিছু দর্শক ও সমালোচক বহু দশক আগে ঋত্বিকের “বাজে” ধারার নিঃসরণরূপে দেখেছিলেন, অথবা সম্ভবতঃ তাঁর নিজের প্রত্যাখ্যাত প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা হিসেবে, সে সবকিছু বিশ শতকের চোখে (ও কানে) জাঁ-লূক গদার বা লঁ রামসেঁর ফিল্মের মতো জটিল ও অশান্ত্ম একটি ফিল্মি ভাষার সাক্ষ্যরূপে আসে। ঋত্বিক ছিলেন ভাঙনের কবি। ১৯৬০ সালে তাঁর মেঘে ঢাকা তারা মুক্তি পাওয়ার আগেই চলচ্চিত্র নির্মাণে দুটি বিরোধী প্রবণতার মধ্যে তিনি পরিপূর্ণ সমন্বয় সাধন করেছিলেন: একটি হচ্ছে mise-en-scene এর লক্ষ্য, যা একটি সুরের মাঝে চরিত্রের স্থানীকরণ ও চলাচলের ওপর স্থাপিত, আর অন্যটি মন্ত্মাজ রীতি, যা একটি দৃশ্যের সাথে অন্যটির গ্রাফিক সংঘর্ষকে উজ্জ্বল করে। আসলে ঋত্বিক আইসেনস্টাইনের মন্ত্মাজের আদর্শগুলোকে তাঁর ছবিতে নিয়ে এসেছিলেন – যে আইসেনস্টাইনকে তিনি অন্য সকল গুরুর উপরে তুলে ধরতেন – আর তা তিনি করতেন ফিল্ম বানানোর দুই পর্বের উভয়টিতেই: প্রতিটি ফ্রেম যেন ছিল একেকটি যুদ্ধ, আর প্রতিটি কাট দৃশ্যকে আরও খন্ডিত করেছে।
তিতাস একটি নদীর নাম ছবিটি অদ্বৈত মল্লবর্মণের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে লেখা, যে উপন্যাস লেখকের মৃতু্যর পাঁচ বছর পর ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয়; তাঁর খ্যাতি অংশতঃ সেই সত্য থেকে আসে যে তিনি ঠিক সে ধরনের দারিদ্র্য থেকে সংগ্রাম করে উঠে এসেছিলেন যেমনটা ঋত্বিকের ছবিতে দেখা যায়। গল্পের পটভূমি ১৯৩০ এর দশকের শুরুর দিকে আর তাই আক্ষরিকভাবে এটি দেশভাগের সময়কালের গল্প নয়, কিন্তু দেশভাগের ঘাত-প্রতিঘাতকে শিল্পে রূপ দেয়া ছিল ঋত্বিকের একটি প্রবণতা; যিনি কিনা তাঁর দেখা ইতিহাসের সমগ্রতাদানের মাধ্যমে সেটিকে বিস্তৃত করেছিলেন। সত্যিকারভাবে, একটি স্ত্মরে, এটি ছিল সমকালীন বাস্ত্মবতার খুব কাছাকাছি: অবশেষে ১৯৭১ সালে অর্থাৎ মাত্র দু’বছর আগে পাকিস্ত্মান থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। যা হোক, পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে ঋত্বিকের সহকর্মীরা তাঁকে একটিমাত্র মুহূর্ত, অর্থাৎ দেশভাগের ঘটনার ওপর নিবিষ্ট বলে গণ্য করা শুরু করলেন, যেমনটা ভারতীয় বিজ্ঞ মৈনাক বিশ্বাস লিখেছেন, ঋত্বিক “তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য বিচ্ছিন্নতা-সৃষ্টিকারী ও ধবংসাত্নক সবকিছুর প্রতীক হিসেবে ঘটনাটিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা শুরু করলেন, আর দেশের ক্রমবর্ধমান অলবক্ষয়ের কথা কখনও কখনও শুধু সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে বলতে লাগলেন।” তবুও তাঁর উদ্দেশ্য আমাদের কাছে এখন স্পষ্টতর: একদিকে, দেশভাগ দ্বারা সংঘটিত ট্র্যাজিক ও আকস্মিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বঞ্চনার বিপুল কুয়াশার সাথে তিনি সংগ্রাম করছিলেন; অন্যদিকে ভারতের সামাজিক আধুনিকায়নকে চালিত করা প্রগতির সরল উদযাপনেরও তিনি বিরোধী ছিলেন। তিতাস একটি নদীর নাম ছবির প্লটটি একটি খাঁটি মেলোড্রামা – যে ফর্মটিকে ঋত্বিক ভারতের প্রাসঙ্গিকতায় তাঁর জন্মগত অধিকার বলে সগর্বে দাবী করতেন। তিনি সংস্কৃতির চিরায়ত চিত্রকে বৃহত্তম ভারতীয় দর্শকের কাছে পরিচিত করে তুলেছেন, যেমন – ভুক্তভোগী মা, গ্রামের জ্ঞানী (কিংবা খ্যাপাটে) বৃদ্ধ লোক, পাড়ার আড্ডা, লাজুক, কুমারী বধূ ……… আর তারপর বর্ণনার রীতিকে দুমড়ে চুমড়ে ফেলেছেন, আর তা করেছেন একইসাথে সূক্ষভাবে ও উসকানিমূলকভাবে। ঋত্বিকের ব্রেখটের নাটকের সাথে পরিচয় থাকার সুবাদে ফিল্মটি একটি ভগ্ন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসংলগ্ন মেলোড্রামা, স্পষ্টতঃ দু’টি অংশে বিভক্ত, আর এতে একটি চরিত্রের গল্পের সূত্র থেকে আরেকজনের গল্পে চলে যাওয়ার স্বাধীনতা নেয়া হয়েছে – আর তা সেকালের বিশ্ব চলচ্চিত্রে একটি অনন্য কৌশল। ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে যেমনটি প্রায়শঃ ঘটে, সবকিছু – সব আবেগ ও সমস্যা – শৈশব ও কৈশোরের গঠনকালে সূচিত হয়। আমরা বাসন্ত্মী নামের এক বালিকার সাথে পরিচিত হই (রোজী সামাদ যে চরিত্রের অভিনয়ের বেলা চরিত্রটিকে প্রাপ্তবয়স্কের মতো উপস্থাপন করেছেন), কিশোরকে (প্রবীর মিত্র) বিয়ে করার জন্য যাকে একদিন হতাশায় ভুগতে হয়, যে কিনা তার বন্ধু সুবলের সাহচর্যে থাকে। তারপর এই দুই পুরুষ নদীর ধারের আরেক গ্রাম উজানীনগরে চলে যায় যেখানে কিশোর পরিচয়ের সাথে সাথেই রাজার ঝির (কবরী চৌধুরী) সাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। তাদের চোখের পলকে কেটে যাওয়া ফুলশয্যার রাতের মিলন থেকে তারা একটি শিশুর জন্ম দেবে, কিন্তু নিজ স্বামীকে দেখার সৌভাগ্যই রাজার ঝির হবে না। নদীতে নৌকায় ফিরে (যেখানে রাজার ঝি এখনও কিশোরের দিকে লজ্জায় তাকায় না) আসার পর এই দম্পতির মিলন[-সুখের ওপর দুর্যোগ নেমে আসে: রাজার ঝিকে হরণ করা হয়। সে বেঁচে যায় আর ভাসতে ভাসতে তিতাসের তীরে গিয়ে ভিড়ে, কিন্তু কিশোর – যে সেই ঘটনার পরিণতিতে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে – কোনোদিন সে কথা জানবে না। এসবেরই মাঝে সুবলের সাথে বাসন্তীর বিয়ে হয় – যে পরের দিনই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। আর এতো সব ঘটনা ১৫৬ মিনিট দীর্ঘ একটি ফিল্মে মাত্র ত্রিশ মিনিটেই কিনা শেষ!
movie_review_titas_ekti_nodir_naam_content2
সব ঘটনা কিন্তু ফিল্মটিকে দেখানো হয়নি; কখনও কখনও আমরা এগুলো পেছন থেকে জানতে পারি (যেমন – বাসন্তীর বিয়ের ক্ষেত্রে)। ঋত্বিক তাঁর গল্পকে সাজাতে কখনও কখনও দীর্ঘ লাফ পছন্দ করতেন। কিছু শক্তিমান, প্রভাববিস্তারকারী ছড়া – যেমন তরুণী বাসন্তী তিতাসের “শেষ ফোঁটা” সম্পর্কে ফিল্মের শুরুতেই শোনে, “যা ছাড়া আমাদের আত্মার মুক্তি মিলে নাকো”, যে শব্দগুলো ছবিটির চূড়ান্ত্ম দৃশ্যে তার কাছে ধ্বনিত হয় – ছবির সব দৃশ্য বিস্ত্মারিতভাবে অনুসরণ করার চেয়ে বরং সেই ছড়াগুলোই ফিল্মের অর্থ উন্মোচনে বেশি কার্যকর। আসলে ঋত্বিকের (ব্যক্ত) উদ্দেশ্যই ছিল মেলোড্রামার কৌশলকে উন্নীত করা – ক্রূঢ় ঘটনাগুলো (যেমন একে অপরের অতীতের কথা না জেনেই বাসন্ত্মী ও রাজার ঝির বান্ধবী হওয়া), পীড়াদায়ক বিভিন্ন পরিণতি (রাজার ঝির “হারানো প্রেমাস্পদের” সাথে স্থানবদলের কথা চিন্ত্মা করে উন্মাদ কিশোরের প্রেমে পড়া, যার সত্যিকার পরিচিতি তার কাছে অজানা) আর তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ব্রেখটের এপিক থিয়েটারের অনুকরণে এসব ঘটনাকে এক সূত্রে গাঁথা। মেলোড্রামায় থাকা সবকিছুই চরিত্রগুলোর শক্তি ও সচেতন ইচ্ছাশক্তি থেকে ঘটনাগুলোকে মুছে দেয় – যেগুলো সম্ভাবনা বা দুর্ভাগ্যের নারকীয় বৃত্তে তাদেরকে তুলে দেয় – ঋত্বিকের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক ক্ষেত্র ছিল; তিনি বিশ্বাস করতেন যে ব্যক্তিক বোধের চেয়ে শক্তির গুরুত্ব বেশি – যেসব শক্তি একই সাথে এসব মানবীয় আন্ত্মঃসম্পর্কের ভেতর, ইতিহাসের এসব দীর্ঘ-বিলম্বিত শিকারদের মাঝে অনুমেয়।
ইতিহাস স্বয়ং ঋত্বিককেই প্রায় শিকার বলে দাবী করেছিল, আর তা কেবল সেই পথেই নয় যা তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত্ম করেছিল। ১৯৭৬ সালে মৃতু্যকালে তাঁর জীবনের সর্বশেষ ও সর্বাধিক পরীক্ষামূলক ফিল্ম যুক্তি-তক্কো-গপ্পো, যা তিনি দু’বছর আগেই শেষ করেছিলেন, তা থিয়েটারে (অর্থাৎ সিনেমা হলে) মুক্তি পায়নি; তাঁর স্ত্রী সুরমা পরে একথা বলে আক্ষেপ করেছিলেন যে তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে (যিনি ঋত্বিকের অনুরক্ত ভক্ত ছিলেন) এই ফিল্মের কাজে হস্তক্ষেপ করতে অনুরোধ করেননি। আর যখন, বিশেষ করে আশির দশক থেকে, সারা বিশ্বে তাঁর সৃষ্টির উদ্ভাবনী সমালোচনা চলছিল, সামগ্রিকভাবে তাঁর সৃষ্ট চলচ্চিত্র এবং সেসবের জৈবিক উপাদানগুলো অবহেলার শিকার হয়েছিল। ঋত্বিক স্মৃতি ট্রাস্টের অবদানের ফলশ্রুতিতে (আর বিশেষ করে ঋত্বিকপুত্র ঋতবানের অক্লান্ত চেষ্টায়) তিতাস একটি নদীর নাম ছবির অসমাপ্ত ক্যামেরা ও সাউন্ড নেগেটিভ, যা ভারতীয় ফিল্ম আর্কাইভের সংগ্রহে আছে, তার সাথে বার্লিনের একটি ফিল্ম আর্কাইভের দেয়া ছবির সম্পূর্ণ পজিটিভ প্রিন্ট বিশ্ব সিনেমা প্রকল্পের হাতে চলে যায়, যা তাদেরকে সিনেটেকা দি বোলোগনা’স এল’ইমাজিন রিট্রোভাটা ল্যাবরেটরিতে ফিল্মটির নতুন সংস্করণ তৈরিতে সাহায্য করে, আর তা ২০১০ সালে সমাপ্ত হয়। এই ফিল্মটির ডিজিটাল রূপে পুনরুদ্ধার- যা শুরুর দিককার কৃতিত্বসমূহের সমন্বিত বিনোদনকে হিসেবের মধ্যে রাখে – তা সংরক্ষণার্থে একটি নতুন ৩৫ মি.মি. ইন্টারনেগেটিভ প্রস্তুত করা হয়। এটি হচ্ছে একটি দীর্ঘ ও বাঁকা পথ যা এই কাজটিকে সীমাবদ্ধরূপে সহজলভ্য করেছে- আর ঋত্বিকের শিল্পনির্মিতিকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দান করেছে। তাঁর স্ত্রী সুরমা ঘটক তাঁর ক্রমবর্ধমান খ্যাতি অবলোকন করে সম্প্রতি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এই বলে যে ঋত্বিক সম্ভবত কোনো ভবিষ্যদ্বক্তা ছিলেন যিনি তাঁর অমর ভবিষ্যৎ নির্ণয় করে গেছেন। এই কল্পচিত্র তিতাস একটি নদীর নাম ছবির স্রষ্টার ক্ষেত্রে কতো ভালাভাবে খাপ খায়, যাতে (ভৌতিক গল্পের মতো) “মৃত্যুর পর মা শত্রুতে পরিণত হয়” কারণ সেই মা জীবিত লোককে ঈর্ষা করেন আর তাকে নিজের সমান করার চেষ্টা করেন। জীবিতকালে ঋত্বিক ঘটক ছিলেন এক বিড়ম্বিত সত্তা; আর এখন তিনি সেই মহাত্মা যিনি বিশ্ব সিনেমাকে তাঁর সিসমোগ্রাফিক আঘাতে তাড়িত করেন।

No comments yet.

-যা কিছু বলার-